বাংলা সাহিত্যের অপরাজেয় কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তাঁর উপন্যাসে মানুষের অন্তরে তার ধর্মীয় ও সামাজিক বিশ্বাস-সংস্কারের সাথে প্রণয়াকাঙ্ক্ষার যে নিরন্তর দ্বন্দ্ব-সংঘাত, গার্হস্থ্য ও সমাজজীবনের প্রতিচ্ছবি অসাধারণভাবে শিল্প কুশলতার সাথে অঙ্কিত হয়েছে। বাঙালি সমাজে নারীর বঞ্চনা, নারীর দুঃখ তাঁর উপন্যাসের অন্যতম দিক।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৫ সেপ্টেম্বর, ১৮৭৬ সালে (৩১ ভাদ্র, ১২৮৩ বঙ্গাব্দ) হুগলীর দেবানন্দপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
তিনি মাতৃবিয়োগের (১৮৯৫) কারণে চরম অর্থকষ্টে নিপতিত হন এবং ১৯০৩ সালে ভাগ্যান্বেষণে রেঙ্গুন (বার্মা) গমন করেন।
তিনি মাঝে মাঝে অনিলা দেবী, অপরাজিতা দেবী, শ্রী চট্টোপাধ্যায়, অনুরূপা দেবী, পরশুরাম (এটি রাজশেখর বসুরও ছদ্মনাম), শ্রীকান্ত শর্মা ও সুরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় ছদ্মনামে লিখতেন।
তিনি ১৯২৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জগত্তারিণী স্বর্ণপদক এবং ১৯৩৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি. লিট ডিগ্রী লাভ করেন।
তাঁর রচিত উপন্যাসে প্লটের তুলনায় চরিত্রের প্রাধান্য দেখতে পাওয়া যায়। তিনি সমাজে প্রচলিত বর্ণ-বিভাজনকে তাঁর লেখায় প্রশ্রয় দেননি।
তিনি ১৬ জানুয়ারি, ১৯৩৮ সালে (২ মাঘ, ১৩৪৪ বঙ্গাব্দ) পাক নার্সিংহোমে মৃত্যুবরণ করেন।
শরৎচন্দ্রের প্রথম প্রকাশিত গল্পের নাম 'মন্দির': গল্পটি প্রথমে তাঁর মামা ও বাল্যবন্ধু সুরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের নামে 'বসুমতি' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এটি ১৯০৩ সালে কুন্তলীন পুরস্কার পায়। চরিত্র: অমরনাথ, অপর্ণা, শক্তিনাথ।
শরৎচন্দ্রের উপন্যাসগুলো:
'বড়দিদি' (১৯০৭): এটি তাঁর প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস। এটি সরলা দেবী সম্পাদিত 'ভারতী' পত্রিকায় প্রথম প্রকাশ পায়। প্রথমে এটির নাম ছিল 'শিশু'। মাধবীর নাম 'বড়দিদি'। চরিত্র: মাধবী, সুরেন্দ্রনাথ, ব্রজরাজ, প্রমীলা।
'বিরাজ বৌ' (১৯১৪): উপন্যাসটি 'ভারতবর্ষ' পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়। সুন্দরী বিরাজ বৌয়ের নানাবিধ সমস্যা উপন্যাসের মূল বিষয়বস্তু। চরিত্র: বিরাজ, নীলাম্বর, পীতাম্বর।
'পরিণীতা' (১৯১৪): বিংশ শতাব্দীর প্রথম সময়ের ভারতের কলকাতার পটভূমিতে উপন্যাসটি রচিত। চরিত্র: ললিতা, গুরুচরণ, আন্নাকালী, চারু, শেখর রায়, মনোরমা, গিরীন।
'পল্লীসমাজ' (১৯১৬): উপন্যাসটি ১৯১৫ সালে 'ভারতবর্ষ' পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়। ১৯১৬ সালে ১৯টি পরিচ্ছেদে 'ভারতবর্ষ' পত্রিকার মালিক গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় অ্যান্ড সন্স উপন্যাসটি প্রকাশ করেন। 'কুঁয়াপুর' নামক গ্রামকে কেন্দ্র করেন বাংলার সামন্ততান্ত্রিক সমাজ-ব্যবস্থা, পল্লিজীবনের নীচতা ও ক্ষুদ্র রাজনীতির পটভূমিকায় এক আদর্শবাদী যুবক-যুবতীর সম্পর্ক ও বিশেষ করে তাদের অভিশপ্ত প্রেমকাহিনি এই উপন্যাসের মূল বিষয়। রমা ও রমেশের প্রেমের মাঝে এতো তিক্ততা ছিলো যে, রমা মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়ে রমেশকে জেলে পাঠাতেও দ্বিধা করেনি। এ উপন্যাসের নাট্যরূপ 'রমা' (১৯২৮)। চরিত্র: রমা, রমেশ, বেণীমাধব, বিশ্বেশ্বরী।
'নিষ্কৃতি' (১৯১৭): এ উপন্যাসের প্রথমাংশ 'ঘরভাঙা' নামে 'যমুনা' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ভবানীপুরের চাটুয্যেদের একান্নবর্তী পরিবার এবং সেই পরিবারের সম্পর্কের জটিলতা এ উপন্যাসের মূল বিষয়। চরিত্র: গিরিশ, হরিশ, সিদ্ধেশ্বরী, শৈলজা, রমেশ, নয়নতারা। ১৯৪৪ সালে Deliverance নামে দিলীপকুমার রায়ের ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয়। এটি গল্প আকারে রচিত হলেও পরবর্তীতে শরৎচন্দ্র পরিবর্ধিত করে উপন্যাস আকারে প্রকাশ করেন।
'শ্রীকান্ত' (১ম খণ্ড- ১৯১৭, ২য় খণ্ড- ১৯১৮, ৩য় খণ্ড-১৯২৭, ৪র্থ খণ্ড- ১৯৩৩): এটি তাঁর আত্মজৈবনিক উপন্যাস। এ উপন্যাসে শরৎচন্দ্র 'শ্রীকান্ত শর্মা' ছদ্মনাম ব্যবহার করেছেন। চরিত্র: রাজলক্ষ্মী, ইন্দ্রনাথ, শ্রীকান্ত, অভয়া। ইন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কিশোর চরিত্র।
'দেবদাস (১৯১৭): দেবদাস, পার্বতী, চন্দ্রমুখী অন্যতম চরিত্র।
'চরিত্রহীন' (১৯১৭): এটি প্রথমে ধারাবাহিকভাবে 'যমুনা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। প্রথা বহির্ভূত প্রেম ও নারী-পুরুষের সমাজ অননুমোদিত সম্পর্ক এ উপন্যাসের মূল বিষয়। চরিত্র: সতীশ, সাবিত্রী, দিবাকর, কিরণময়ী, সরোজিনী।
'দত্তা' (১৯১৮): উপন্যাসটি ১৩২৪-১৩২৫ বঙ্গাদে 'ভারতবর্ষ' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। চরিত্র: নরেন, বিজয়া, রাসবিহারী, বনমালী। এ উপন্যাসের নাট্যরূপ 'বিজয়া' (১৯৩৪)
'বামুনের মেয়ে' (১৯২০): এ উপন্যাসে তৎকালীন সমাজের জাতিভেদ, কুসংস্কার ও আর্থিক বৈষম্যের বিষয় উপস্থাপিত হয়েছে। চরিত্র: রাসমণি, গোলোক চাটুয্য, জ্ঞানদা।
'দেনা-পাওনা' (১৯২৩): এ উপন্যাসের বিখ্যাত চরিত্র: জীবানন্দ, ষোড়শী। উপন্যাসটি 'ষোড়শী' নামে নাট্যায়িত হয়
'পথের দাবী' (১৯২৬): এটি রাজনৈতিক উপন্যাস জ সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত হয়। চরিত্র: সব্যসাচী।
'বিপ্রদাস' (১৯৩৫): এটি শরৎচন্দ্রের জীবিতাবস্থায় প্রকশি সর্বশেষ গ্রন্থ। উপন্যাসটি 'বিচিত্রা' পত্রিকায় প্রকাশিত হয় চরিত্র: বিপ্রদাস, দ্বিজদাস, বন্দনা।
'শেষ প্রশ্ন' (১৯৩১): এটি শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিতর্কপ্রধান ও সমস্যামূলক উপন্যাস। উল্লেখযোগ্য চরিত্র শিবনাথ-মনোরমা, অজিত-কমল, নীলিমা-আশুবাবু।
'শেষের পরিচয়' (১৯৩৯): এটি তাঁর সর্বশেষ উপন্যাস এটি শরৎচন্দ্র লেখা শেষ করে যেতে পারেননি। বাকী অংশ রাধারানী দেবী কর্তৃক রচিত। উপন্যাসটি 'ভারতবর্ষ' পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়।
'নারীর মূল্য' (১৯২৩): এটি নারীর সামাজিক অধিকার ও সমাজে নারীর স্থান সম্পর্কিত প্রবন্ধ। এটি তিনি 'অনিলা দেবী' ছদ্মনামে রচনা করেন, যা 'যমুনা' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। অনিলা দেবী শরৎচন্দ্রের বড় বোনের নাম।
'তরুণের বিদ্রোহ' (১৯২৯): এ প্রবন্ধটি ১৯২৯ সালের ৩০ মার্চ রংপুর বঙ্গীয় যুব সম্মিলনীর অধিবেশনে সভাপতির ভাষণ। এ গ্রন্থের দ্বিতীয় সংস্করণে 'সত্য ও মিথ্যা' নামে আরো একটি প্রবন্ধ অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
'স্বদেশ ও সাহিত্য' (১৯৩২)।
শরৎচন্দ্রের উল্লেখযোগ্য ছোটগল্পগুলো:
'কাশীনাথ' (১৯১৭): সতের বছর বয়সে তিনি সর্বপ্রথম পাঠশালার সহপাঠী কাশীনাথের নামে গল্পটি লিখেন।
'বিলাসী': সাধু রীতিতে রচিত ন্যাড়া নামের এক যুবকের জবানিতে বিবৃত এ গল্পের কাহিনিতে শরৎচন্দ্রের প্রথম জীবনের ছায়াপাত ঘটেছে। গল্পটিতে বর্ণিত হয়েছে ব্যতিক্রমধর্মী দুই মানব-মানবীর চরিত্রের অসাধারণ প্রেমের মহিমা, যা ছাপিয়ে উঠেছে জাতিগত বিভেদের সংকীর্ণ সীমা। চরিত্র: বিলাসী, মৃত্যুঞ্জয়, খুড়া, ন্যাড়া।
'বিন্দুর ছেলে ও অন্যান্য গল্প' (১৯১৪): এটি বিন্দুর ছেলে, রামের সুমতি ও পথনির্দেশ গল্পের সংকলন। এ গল্পগুলি ' যমুনা' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
'মেজদিদি' (১৯১৫): এটি মেজদিদি, দর্পচূর্ণ ও আঁধারে আলো গল্পের সংকলন। এ তিনটি গল্পই চলচ্চিত্রায়িত হয়েছে। 'মেজদিদি'র চরিত্র: হেমাঙ্গিনী, কেষ্ট, কাদম্বিনী।
'ছবি' (১৯২০): এটি ছবি, বিলাসী ও মামলার ফল গল্পের সংকলন।